দেশের উন্নয়নে অঞ্চলগত বৈষম্য দূর করতে হবে

সোমবার, ১০ জুলাই ২০১৭ ১৬:১০ ঘণ্টা

বাংলাদেশে যে বিভাগগুলো রয়েছে তার মধ্যে রংপুর বিভাগ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যপীড়িত। ঘর-গৃহস্থালির মাসিক আয় এবং খরচ রংপুর এলাকায় সবচেয়ে কম। মানব উন্নয়ন সূচকে অন্তর্ভুক্তিকরণ প্রয়াস কেবল পারে সমতা ও ন্যায্যতাভিত্তিক উন্নয়ন কাঠামোকে সুসংহত করতে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শুরু হয়ে ২০১৯-২০ সালে শেষ হবে তাতে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, ১৩ দশমিক ২ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং মোট দেশজ উত্পাদনের হার বৃদ্ধি পাবে ৮% হারে। গত অর্থবছরে ৭ দশমিক ১৪% হারে জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেলেও চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৪০% হারে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হয়েছে।

উন্নয়নের মহাসড়কে যাত্রাপথে আমরা এখন টেইক অফ অবস্থায় আছি। এ অবস্থায় যদি অঞ্চলগত বৈষম্য প্রয়োজনের ভিত্তিতে দূর করে অঞ্চলগত স্বনির্ভরতার আওতায় আনা যায় তবে দেশ ও দশের উন্নয়ন সম্ভব হবে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অর্থনীতিকে গ্রামীণ ভিত্তি থেকে আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সেবা খাতে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতির হার হ্রাস, জাতীয় সঞ্চয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পেটে-ভাতে রাজনৈতিক অর্থনীতির মূল দর্শনকে সমাজের নিচু স্তর থেকে আরম্ভ করে উচ্চ স্তর পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে উন্নয়ন পরিকল্পনায়। তবে যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা সত্যিকার অর্থে প্রয়োজনের নিরিখে বাস্তবায়ন করতে হয়। এজন্যে উন্নয়ন পরিকল্পনায় টপ-ডাউন অ্যাপ্রোচ এবং বটম আপ অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের সঙ্গে উচ্চমহলের একটি যোগসূত্র স্থাপন করা দরকার। এ জন্যে স্থানীয় এমপিদের সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং মধ্যম পর্যায়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও সিটি করপোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলরদের একটি সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক থাকার পাশাপাশি যখনই কোনো সমস্যা হবে তখনই সমস্যা সমাধানে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

আসলে সরকারপ্রধান নির্দেশ দেবেন—কিন্তু যারা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কাজ করবেন তাদের অবশ্যই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩১.৯০৩ ট্রিলিয়ন টাকা যার মধ্যে ২৮.৪৫১ ট্রিলিয়ন টাকা অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে এবং ৩.০৫২ ট্রিলিয়ন টাকা বিদেশি অর্থায়নে সংগৃহীত হবে। ঐ পরিকল্পনায় ৭.২৫২ ট্রিলিয়ন টাকা পাবলিক সেক্টর থেকে এবং ২৪.৬৫১ ট্রিলিয়ন বেসরকারি খাত থেকে আসবে। বেসরকারি বিনিয়োগ যত বৃদ্ধি পাবে তত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের বদলে সরকার চাচ্ছে বিভিন্ন অঞ্চলগত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে। যে সমস্ত অঞ্চল পিছিয়ে আছে তাদের জন্যে অবশ্যই অঞ্চলগত উন্নয়ন প্রয়াস গ্রহণ বেশি করে করতে হবে। কোনো অঞ্চলে দারিদ্র্য বেশি, জনসংখ্যা অনুপাতে আয়-রোজগার কম সে সমস্ত অঞ্চলে সুষ্ঠু পরিকল্পনা করে একটিভিটি বেইজড ফোকাসড উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা দরকার। পাশাপাশি জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং হিসাব রাখার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

সপ্তম পঞ্চম বার্ষিক পরিকল্পনায় মোট জনসংখ্যার ২০% উচ্চ শিক্ষিত হবে বলে আশা করা হয়েছে। কিন্তু এই ২০% উচ্চশিক্ষিতের অধিকাংশই যেন কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে সেদিকে বিশেষ নজর দেয়া দরকার। কারিগরি শিক্ষাকে আলাদা মর্যাদা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দেশে কারিগরি শিক্ষার হার মাত্র ১০% যেখানে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষার হার হচ্ছে গড়ে ৪৩%। এদিকে বিআইডিএসে যে উচ্চতর অর্থনৈতিক শিক্ষা প্রদানের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে তা সফল করতে হলে জাতীয় সংস্থাটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গীভূত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিতে হবে। আবার বিআইডিএস উচ্চ শিক্ষার জন্যে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালস-এর অধিভুক্ত হতে পারে। এ ব্যাপারে বিআইডিএস-এর পরিচালনা পর্ষদকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা যেন দেশ ও জাতি গঠনে কাজে লাগে এবং মানবতাবাদী ব্যবস্থা সংযুক্ত থাকে সেজন্যে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। অঞ্চলগত বৈষম্য হ্রাস করতে হলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণই শেষ কথা নয়—কর্মসংস্থানই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অবশ্যই অঞ্চলগত বৈষম্য দূরীকরণ এবং কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে।

দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্যে সরকার বেশকিছু মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে হাসপাতাল, শিক্ষালয়, ব্রিজ, কালভার্ট, বন্ধ হয়ে যাওয়া নৌপথ চালুকরণ, স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক চালুকরণসহ স্থানীয় পর্যায়ে যেসব পণ্য উত্পাদন সহজ এবং যার কম্পিটিটিভ অ্যাডভেনটেজ আছে সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে একটি আলাদা পরিকল্পনার আওতায় স্থানীয় এমপি, চেয়ারম্যান/মেয়রদের সমন্বয়ে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে হবে। বর্তমান সরকারের আমলে দারিদ্র্য সার্বিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। তবে গিনিসহগ এখন ০.৩৫— যা ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নির্দেশ করে থাকে। দারিদ্র্যের বিচারে রংপুর বিভাগের পরই দেখা যাচ্ছে বরিশাল অঞ্চলের অবস্থান। তৃতীয় স্থানে রয়েছে খুলনা বিভাগ। সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে সমস্ত প্রয়াস গ্রহণ করেছে সেগুলো আরো বেগবান করতে হলে বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগ করতে হবে। দেশ থেকে অর্থ পাচার বন্ধ এবং দুর্নীতি হ্রাস করা গেলে সরকারের সাধু উদ্দেশ্য অধিকতর ফলবান হবে। সরকারের প্রয়াসে মঙ্গার ভয়াবহতা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্যে এবং আয় প্রবাহ বাড়ানোর প্রয়োজনে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক সীমিত আকারে যে এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করেছে তা দিয়ে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে না। বরং এজন্যে পৃথক রেগুলেটরের আওতায় কমিউনিটি ব্যাংকিং চালু করা দরকার— যা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষকে কেবল ক্ষুদ্র সঞ্চয় নয় বরং ক্ষুদ্র বিনিয়োগে সহায়তা করবে। সামাজিক উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র সঞ্চয়-ক্ষুদ্র বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্যে ডাকঘর, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশন এবং কর্মসংস্থান ব্যাংককে পৃথক রেগুলেটরের আওতায় কাজ করতে পারে। এতে এমএলএম কোম্পানিগুলো কিংবা যে সমস্ত এনজিও মহাজনী ব্যবসা করে তাদের হাত থেকে দরিদ্র-হতদরিদ্র মানুষদের বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।

বৈষম্য হ্রাসের জন্যে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে তা যেন ভালোভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রবৃদ্ধি সহায়ক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। সরকার এসডিজি বাস্তবায়নে যে কমিটি গঠন করেছে তা আরো প্রসারিত করে এতে অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী, সমাজবিজ্ঞানীদের কাজে লাগাতে হবে— যারা সরকারের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবে। প্রকল্পসমূহ মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা করে যেটুকু প্রয়োজন সে অর্থ দিতে হবে। যদি ১০০ কোটি টাকা কোনো প্রকল্পের জন্যে প্রয়োজন হয় সেখানে ১০ কোটি টাকা দিলে তা সমাধান হবে না। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প সমাধার ব্যবস্থা করতে হবে। যে সমস্ত অঞ্চল পিছিয়ে আছে সেগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আঞ্চলিক অসাম্য দূর করতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গ্রহণ করতে হবে। সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নতির জন্যে ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যাষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করতে হবে। নীতিমালা থাকলেই হবে না, বরং সততাভিত্তিক বাস্তবায়নের ব্যবস্থা দরকার। বেশ কয়েক মাস হলো সরকারপ্রধান ময়নামতি বিভাগ চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে না। আবার একটি স্বার্থান্বেষী গ্রুপের জন্যে কুমিল্লায় বিমানবন্দর চালু হচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং হাওর অঞ্চলে পিকেএসএফ তাদের পার্টনার অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে সমৃদ্ধি প্রকল্প অধিক হারে গ্রহণ করতে পারে। (সংগৃহিত)

লেখক: ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়্যাল ইকোনোমিস্ট

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…