প্রতিটি ঋতুতে একটু হলেও থাকেই বর্ষা ঋতু

সোমবার, ১০ জুলাই ২০১৭ ১৬:১৪ ঘণ্টা

তবে বাংলার ভাবুক মনের মানুষের ওপর বর্ষার আবেশ ও সম্মোহন গভীর ও ষড়যন্ত্রময়। এ এমন এক ঋতু যাকে উপলক্ষ ও অনুষঙ্গ করে হাজার বছর ধরে বলা হয়েছে বিস্তর কথা, লেখা হয়েছে প্রচুর কাব্য, কবিতা ও ছড়া, গীত হয়েছে অজস্র গান। সম্ভবত আর কোনো ঋতুকে নিয়ে এতটা হয়নি।

সুখী ও আয়েশি মানুষের কথা বাদই দিলাম, জীবন ও জীবিকার চাপে ন্যুব্জ যে মানুষেরা, অবকাশ নেই যাদের একটু উদাসীন হবার, বর্ষা তাদের জন্যও এনে দেয় কিছুটা অবকাশ ও উপশম, মন-আনমন-করে-ফেলা ধারাপাতগীতির জৈব স্পর্শে, জৈব ধ্বনিতে।

রূঢ় বাস্তবের সঙ্গে চলে সংসারী মানুষের প্রাত্যহিক সংঘর্ষ, দৈনন্দিন ঘর্ষণ। ফলে প্রতিনিয়ত আচড় লাগে মানুষের দেহে ও মনে। তৈরি হয় নানা ক্ষয়ের, ক্ষতের। মনে জমতে থাকে ক্লেদ, গ্লানি ও অপমান।
সারা বছরের পুঞ্জীভূত ওইসব গ্লানি ও ক্ষয়ক্ষতির কিছুটা হলেও শুশ্রূষা হয় বর্ষাঋতুতে। এই যে নানা মাত্রার বৃষ্টিধ্বনি, নানা মেজাজের সুর... প্রতিটি ধ্বনি ও সুরের সঙ্গে এক অলৌকিক রসায়নে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিমানুষের নানা স্মৃতি, টুকরো কথা, টুকরো ভাব, আবেগচূর্ণ...।

শুনেছি প্রতিটি বস্তুর রয়েছে এক অন্তর্গত স্পন্দনাঙ্ক, প্রকৃতিবিজ্ঞান যাকে ডাকে ‘ন্যাচারাল ফ্রিকোয়েন্সি’ নামে। বস্তুতে বস্তুতে এই ফ্রিকোয়েন্সি বিভিন্ন ও বিচিত্র। জড় বা অজড়ের এই অন্তরঙ্গ ধ্বনিতরঙ্গের সাথে যখন মিলে যায় বাইরের কোনো ধ্বনিলহরির স্পন্দন, ঐকতানে বেজে ওঠে সেই জড় বা অজড় তখন। উদ্ভব হয় অমিত শক্তির, অভাবিতপূর্ব প্রাণস্ফূর্তির।

প্রতিটি ব্যক্তিমানুষেরও রয়েছে প্রাকৃতিক স্পন্দনাঙ্ক। আর সেই স্পন্দনাঙ্ক যখন মিল পায় খাপ খায় বৃষ্টির বহুবিচিত্র স্পন্দনের সঙ্গে, ঐকতানে বেজে চলে তখন যুগপৎ মানুষের দেহ আর মন।

স্বল্পসংবেদী মানুষ আমি। তা সত্ত্বেও নানা সময়ে আলোড়িত ও আবিষ্ট হয়েছি বর্ষার বিচিত্র সম্মোহনে। মাঝে-মধ্যে ব্যক্ত করতে চেয়েছি আমার সেই আলোড়ন ও উপলব্ধির কথা, কবিতায়--

“প্রতিটি ঋতুতে একটু হলেও/ থাকেই বর্ষা ঋতু// বর্ষাস্বভাবে প্রতিটি ঋতুই/ ঋতুমতী হয় মৃদু//। বর্ষাই মূল পাঠ্যকৃতি/ মূল আখ্যানপাত্র// আর সব ঋতু পাঠসহায়িকা/ টীকা-টিপ্পনী মাত্র।”... ... ...
“সকল বয়স ফিরে যেতে চায়/ বালকবেলার ভোরে// সব ইতিহাস লেখা হতে চায়/ শ্রাবণে নতুন করে।” কিংবা...
“ধারাপাতদেরই সংখ্যারা ঝরে/ ফোঁটা ফোঁটা অক্ষরে// সংখ্যাধারাই বিবেচিত হয়/ বৃষ্টি, মতান্তরে//। পড়শিরা হায় কোথায় যে যায়/ 
কে যে আজ কোন্ ভুবনে!// এক বর্ষায় ভেসে ওঠে তারা/ ঝাপসা অন্য শ্রাবণে।”
শেষ হয়ে আসে উত্তরায়ণের দিন। ক্রান্তিরেখার বুড়ি ছোঁয়া হয়ে গেলে-পরে সূর্য টলতে টলতে চলে যায় ক্রমে দক্ষিণায়নের পথে। তারপরও চলতে থাকে ভাবাবেশ-জাগানিয়া বর্ষার অভিভাবন, শাসন ও শুশ্রূষা... মানুষের, জীবের আর প্রাণপ্রকৃতির সর্বাঙ্গে, সর্বচৈতন্যে। অজান্তেই প্রত্যাশা জাগে... “ছড়িয়ে পড়ুক এই ধারাপাত/ অতীতে, ভবিষ্যতে// শাসন করতে ভেজা দেহমন/ ভিন্ন ধর্মমতে।” (লিখা: ফেইসবুক পেজ থেকে সংগৃহিত)।

লেখক: কবি ও সাহিত্যিক

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…