মুক্তিযুদ্ধে ধর্ম ও আজকের জঙ্গিবাদ

সোমবার, ১০ এপ্রিল ২০১৭ ২১:৩০ ঘণ্টা
অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান
  • ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। সৃষ্টির পরপরই পাকিস্তান ধর্মকে ব্যবহার করে আমাদের ওপর আঘাত করেছিল। বলা হয়ে থাকে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সেই ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানের কবর রচনা করে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সত্যিকার অর্থেই ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের কবর রচনা করতে পেরেছি? তা নিয়ে এখনও যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।


১৯৭০ সালে ছয় দফার ভিত্তিতে নির্বাচন হয়। ৭২.৫৭% নৌকার পক্ষে ভোট দিলেও সেই নির্বাচনে ২৭.৪৩ শতাংশ লোক ছয় দফার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। বিরোধিতা এখান থেকেই শুরু। আমরা বলে থাকি, স্বাধীনতা যুদ্ধে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল- এই কথা প্রকৃত অর্থে সঠিক নয়। তাই যদি হতো তাহলে ১৯৭০-এর নির্বাচনে ২৭.৪৩ শতাংশ ভোট ছয় দফার বিরুদ্ধে গেল কেন? ছয় দফার ভিত্তিতে নির্বাচনই প্রমাণ করে এই অঞ্চলের অনেক লোক কখনও স্বাধীনতা চায়নি, বরং তারা ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানই চেয়েছিল। কেবল তাই নয়, সেই লক্ষ্যে তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। সেই ২৭.৪৩ শতাংশ লোকের বংশধররা এখনও সক্রিয়। সত্তরের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট পড়েছিল ৮৯%। জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদে নৌকা মার্কায় প্রদত্ত ভোটের পার্থক্যের তাৎপর্য হচ্ছে যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল তাদের মধ্যে কেউ কেউ পাকিস্তান নামক ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের অখ-তার পক্ষে ছিল। অর্থাৎ সেই সময়ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বহু লোক ছিল। আমাদের তরুণ প্রজন্ম ১৯৭১ সালে জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। তারা ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙ্গে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, ভাষাভিত্তিক অর্থাৎ ভাষাকে কেন্দ্র করে একটি নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিল। কেউ কেউ এখন প্রশ্ন করেন সেই তরুণরাই কেন আবার জঙ্গীবাদ এবং ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতিতে জড়াচ্ছে? ’৭০-এর ছয় দফাভিত্তিক নির্বাচনের বিপক্ষ অবলম্বনকারী ভোটারদের অধিকাংশই তরুণ ছিল। একাত্তরে তারাই আলবদর এবং রাজাকার হয়েছিল। সেই সময় রাজাকারদের গড় বয়স ছিল ২০ থেকে ২৫ বছর। মুক্তিযুদ্ধের সময় একদল তরুণ স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন, অন্যদিকে আরেক দল তরুণ রাজাকার এবং আলবদরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। বৃদ্ধ বয়সে এসে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সেই তরুণ প্রজন্মের যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের যে অংশ ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তাদের মানস সন্তানরা এখনও সক্রিয় রয়েছে। কাজেই মুক্তিযুদ্ধে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানী চেতনার কবর রচনা হয়েছে এটা বলা যাবে না। ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের মূল বিভক্তি ছিল হিন্দু এবং মুসলমান বিভাজনের ভিত্তিতে দ্বি-জাতিতত্ত্ব। এই অঞ্চলে যারা বাংলাভাষী মুসলমান তারাও পাকিস্তান রাষ্ট্রটি চেয়েছিল। তবে বিভক্তির পুরোটাই কেবল হিন্দু-মুসলমানদের ব্যাপার ছিল এমনও নয়। এখানে বঞ্চনারও একটি বিষয় ছিল। জমিদার এবং রায়তদের ব্যাপার ছিল। জমিদাররা হিন্দু ছিল এবং তাদের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ ছিল। এই অঞ্চল অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভূ-খ-, এটাও আমরা সঠিক বলি না। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ে লিখছেন, ‘...আমার এক বন্ধু ছিল ননীকুমার দাস। ...একদিন ওদের বাড়িতে যাই। ও আমাকে ওদের থাকার ঘরে নিয়ে বসায়। ...আমি চলে আসার কিছু সময় পরে ননী কাঁদো কাঁদো অবস্থায় আমার বাসায় এসে হাজির। ...ননী আমাকে বলল “তুই আর আমাদের বাসায় যাস না। কারণ, তুই চলে আসার পরে কাকীমা আমাকে খুব বকেছে তোকে ঘরে আনার জন্য এবং সমস্ত ঘর আবার পরিষ্কার করেছে পানি দিয়ে ও আমাকেও ঘর ধুতে বাধ্য করেছে।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান, ইউপিএল, পৃ:২৩) হিন্দু জমিদাররা ছিলেন অত্যাচারী। যার ফলে মুসলমানিত্ব ও ইসলামী ভাবধারা জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে সবাই যে ইসলামী রাষ্ট্র চেয়েছিলেন বিষয়টি এমনও নয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের মধ্যে সৃষ্ট ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানই হলো বিশ্বে সর্বপ্রথম ইসলামের নামে রাষ্ট্র। এর পূর্বে কোনকালেই ইসলামের নামে রাষ্ট্র ছিল না। এরপর ১৯৪৯ সালে ইসরাইল হলো ইহুদী রাষ্ট্র। এখনও বিশ্বে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র।

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসের ভিত্তি কোথা থেকে শুরু হবে? ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ থেকে, নাকি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব থেকে। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে করাচীতে পাকিস্তান কন্সটিটিউয়েন্ট এসেম্বলির সভা বসে। ‘সেখানে রাষ্ট্রভাষা কি হবে সেই বিষয়ে আলোচনা চলছিল। মুসলিম লীগ নেতারা উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষপাতী। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ লীগ সদস্যেরও সেই মত। কুমিল্লার কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দাবি করলেন বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক। কারণ পাকিস্তানের সংখ্যাগুরুর ভাষা হল বাংলা’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ: ৯১)। ৮ ফেব্রুয়ারি করাচির কন্সটিটিউয়েন্ট এসেম্বলির সভায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবের জবাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান যা বলেন তার সারমর্ম হলো বাংলা মুসলমানের ভাষা নয়। যারা বাংলা বলে তারা মুসলমান নয়। তখন উর্দু ছিল পাকিস্তানের ৬ শতাংশ মানুষের ভাষা। কাজেই বাংলাদেশের ইতিহাসের ভিত্তি এখান থেকেই শুরু করতে হবে।

এ বছর (২০১৭) প্রথমবারের মতো ‘২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস’ পালিত হয়েছে। কেবল মানুষকে মেরে ফেললেই গণহত্যা হয় কিংবা সকল মানুষকে হত্যা করতে হবে এমন নয়। একটি জাতিগোষ্ঠীর ভাষাকে যদি কেউ কেড়ে নিতে চায় সেটাও গণহত্যা। ১২ ডিসেম্বর ১৯৫১ সালে গৃহীত জাতিসংঘের ২৬০ (ররর) রেজুলেশন অনুযায়ী গণহত্যার সংজ্ঞার মধ্যে ভাষাও পড়ে। একটি জাতির ভাষাকে ধ্বংস কিংবা সংস্কৃতি, জাতীয় অনুভূতি ধ্বংসের পরিকল্পনা করাও গণহত্যার শামিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই গণহত্যা শুরু হয়। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টোতে ধর্মীয় অনুভূতির প্রাধান্য প্রকট ছিল। এটা থাকাও খুব স্বাভাবিক। পাকিস্তান আন্দোলন বাঙালী সমাজ, রাজনীতি, এমনকি মনোজগতকে একমুখী করে তোলে। সে সময়ে মুসলিম শব্দ ত্যাগ করার পরিণতি হতো রাষ্ট্রীয় শত্রু পক্ষের এজেন্টের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ : প্রেক্ষাপট ও ঘটনা, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, পৃ: ২১)। সে সময় ধর্মের বাইরে কিছু বলাই যেত না। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়ার জন্য ১৯৫৩ সালেই মওলানা ভাসানীকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ১৯৫৩ সালের ৩ জুলাই আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান সাংগঠনিক রিপোর্টে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে গণদুশমন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু তখন মুসলিম শব্দটি পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। কারণ ১৯৫৪ সালের নির্বাচন। তখনও ধর্ম একটি ট্রাম্পকার্ড হিসেবে আসে। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক মৃত্যুর পর ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে মওলানা ভাসানী মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়ার লক্ষ্যে বক্তব্য রাখেন। তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন, “...ঢাকায় ছাত্র সমাজ ও জনসাধারণ বাংলা ভাষার আন্দোলন আরম্ভ করে। সরকার এই আন্দোলন পায়জামা পরিহিত হিন্দুদের সৃষ্ট বলিয়া অপপ্রচার চালাইতে শুরু করে।” পাকিস্তান জন্মলগ্ন থেকেই সরকারবিরোধীদের ভারতের দালাল বলে আখ্যা দেয়া হতো। কাজেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে ধর্মের ব্যাপক ব্যবহার ছিল এবং এখনও তা কমেনি। আওয়ামী লীগ নামকরণেও এক ধরনের বিরোধিতা ছিল। কয়েকজন তো বের হয়ে গিয়ে কিছুদিনের জন্য সরকারেও যোগদান করেছিলেন। আগেই উল্লেখ করেছি, ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে নৌকা মার্কা ভোট পায় ৮৯ শতাংশ। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে ভোট পায় ৭২.৫৭ শতাংশ। এই ব্যবধানের কারণ হলো আওয়ামী লীগের মধ্যেই কিছু লোক তথাকথিত ইসলাম এবং পাকিস্তানী কাঠামোর ভাবধারা পোষণ করত। সেই ইসলাম এবং পাকিস্তানী ভাবধারা থেকে কিছু লোক তখনও বিচ্ছিন্ন হতে পারেনি এবং এখনও তারা পারেনি। আওয়ামী লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়ার বিষয়টি অনেকে মানেনি। আর আওয়ামী লীগের দুটি ধারা সব সময়ই ছিল। খন্দকার মোশতাকের পরবর্তী ভূমিকায় আমরা তা দেখতে পাই। পাকিস্তানী কাঠামোতে বামপন্থীদের একটি অংশ যখন দেখতে পায় কমিউনিস্ট এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন আর করা যাবে না। কমিউনিজমের ভবিষ্যত অন্ধকার দেখে, তখন অনেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। ফলে আওয়ামী লীগের প্রগতিশীল ধারা শক্তিশালী হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেষ পর্যন্ত সেই আওয়ামী লীগকে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু পুরো বিষয়টিতে অনেক জটিলতা ছিল। সেই জটিলতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ১৯৫৩ সালের আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘রাষ্ট্র একটি ইহজাগতিক বিষয় আর ধর্ম হচ্ছে পারলৌকিক বিষয়।’ সাম্প্রদায়িকতা এবং সাম্প্রদায়িক মনোভাব তৈরি হওয়া বিষয়গুলো ছিল আরোপিত। কাজেই রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার সাম্প্রতিককালে কিংবা কয়েক বছর আগে শুরু হয়েছে এমনটি ভাবার কারণ নেই। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার অনেক আগে থেকেই ছিল। ৪০-এর দশকের বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রার্থী হয়েছিলেন। নির্বাচন করতে ফরিদপুরে এসেছিলেন। কিন্তু তাকে ফরিদপুরের মানুষ একদিন একরাত পানি থেকে শুরু করে কোন কিছু খেতে দেয়নি। কারণ, কবিতা লেখার কারণে তাকে কাফের ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও তিনি ধর্ম নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন; কিন্তু কাজ হয়নি। তাকে সবাই হিন্দু বলেই আখ্যায়িত করেছে। ব্রিটিশ শাসকরা শেষ পর্যন্ত যাওয়ার আগে ধর্মীয় বিদ্বেষ সৃষ্টি করে গেছে। ধর্মীয় দাঙ্গা কৃত্রিকভাবে তৈরি করা হয়েছে। এই সব বিষয় আমাদের রাজনীতিবিদরা অনেকে বুঝে কিংবা না বুঝে পক্ষ অবলম্বন করেন। ’৭২-এর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ধর্মীয় প্রভাব আস্তে আস্তে কমে যাওয়ার কথা ছিল। ’৭২-এর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা হঠাৎ করে আসেনি। ১৯৫৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সাংগঠনিক রিপোর্টেও এর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল।

আমাদের যতগুলো অর্জন ছিল তা নস্যাৎ হয়ে যায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে। ৪০-এর দশক থেকে সেই ইসলাম এবং পাকিস্তানী ভাবধারার ২৭.৪৩ শতাংশ মানুষ যারা আমাদের ভাষা, কৃষ্টি, কালচার, রবীন্দ্র ও নজরুল সঙ্গীতের বিরোধিতা করেছে তারা ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। এই হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে দেশকে আবার সেই ৪০-এর দশকে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের পুরো অর্জন বিসর্জনে যায়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক নানা পুঁজি এবং অন্যান্য বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আজকাল এসব বিষয় নিয়ে অনেক গবেষণাও হচ্ছে। ৫০ থেকে ৭০-এর দশকে আমরা ভিন্নধর্মী জিহাদ দেখেছি। শ্রেণী সংগ্রামের নামে মানুষ হত্যা আমরা দেখেছি। ভারতের ঝাড়খ-ে এখন এই ধারা চালু রয়েছে। রাতের বেলা বন্দুক দিয়ে শ্রেণীশত্রু খতম করা হয়। কমিউনিস্টরা বলত, ‘ধর্ম বলতে কিছু নেই’। জোর করেই মতাদর্শ চাপিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এখন যারা সক্রিয় রয়েছে তারা বলছে, পৃথিবীতে ‘ধর্ম ছাড়া আর কিছু নেই’। বর্তমান জঙ্গীদের ধর্ম হচ্ছে একেবারে বিশুদ্ধ। সালাফি তত্ত্বীয় ধর্ম। অর্থাৎ তারা যেভাবে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করে তার ব্যত্যয় হলেই খুন করা হবে। কাজেই ধর্মের এই চরমপন্থা একটি মতবাদ হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এর সঙ্গে বঞ্চনার বিষয় জড়িত রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে আইএস আছে কিনা তা নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে। অনেকে বলে থাকেন স্বীকার করাটাই ভাল। মন্ত্রী ও কর্তারা আবার অস্বীকার করেন। তবে এখানে সরাসরি আইএস থাকার দরকার নেই। তাদের ভাবধারা এবং মতাদর্শে বিশ্বাসীদের অভাব নেই। ডিজিটাল যুগে দেশের যে কোন জায়গায় বসে আইএস-এর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব। জঙ্গীবাদের অর্থ দেশ-বিদেশের নানা উৎস থেকেই আসছে। কাজেই কেবল অস্ত্র দিয়ে জঙ্গীবাদ দমন করা যাবে না। জঙ্গীবাদ দমন করতে হলে আমাদের আবার বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ফিরে যেতে হবে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান।’

আমরা বাঙালী ছিলাম হাজার বছর যাবত আর মুসলমান হয়েছি সেদিন। ১২০৫ সালের আগে আমরা কেউ মুসলমান ছিলাম না। ১২০৫ সালের পরে আমরা মুসলমান হয়েছি। আর হাজার হাজার বছর আগে আমরা মানুষ ছিলাম। কাজেই আমরা প্রথমে মানুষ, পরে বাঙালী আর অতিসাম্প্রতিককালে আমরা মুসলমান। আমাদের মুসলমানিত্ব মরুভূমির মুসলমানিত্ব থেকে আলাদা। বর্তমানে আমাদের অবয়ব এবং চেহারায় যে ছাপ তা আসল নয়। এটা মরু রেমিটেন্সের সঙ্গে আমদানি করা অবয়ব। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভাবধারা যুক্ত হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক চরমপন্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল; কিন্তু টিকে থাকতে পারেনি। কাজেই বর্তমানে যে চরমপন্থা তা আপনি আপনি নিঃশেষ হয়ে যাবে। তবে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা এক জিনিস নয়। ধর্মনিরপেক্ষতার আসল অর্থ হচ্ছে ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের কোন সম্পর্ক থাকবে না। যেমন ছিল আওয়ামী লীগের প্রথম ঘোষণাপত্রে। ঐ ঘোষণাতেই ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা রাখার কথা বলা হয়- ‘ইহকাল রাষ্ট্রের উপর এবং পরকাল ধর্মের উপর ন্যস্ত। ব্যক্তিজীবন স্রষ্টার এবং সমাজজীবন রাষ্ট্রের।’

লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

এমআর

প্রথম আলো

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…