পাকিস্তানে কি আবার মার্শাল ল আসছে?

সোমবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৭ ১৪:১৩ ঘণ্টা

সত্তর বয়সী যে দেশের ৩৩ বছর কেটেছে সামরিক বাহিনীর শাসনে, সে দেশে নতুন করে অভ্যুত্থানের গুজব স্বভাবত চমকে ওঠার মতো খবর নয়। তবে দেশটি যখন পাকিস্তান, তখন অন্তত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবার জন্য তাতে উদ্বেগের কারণ রয়েছে বৈকি।

স্বাধীন পাকিস্তান গত সাত দশকে লিয়াকত আলী খান থেকে শাহেদ আব্বাসি পর্যন্ত ২৪ জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে—অনেকে একাধিক দফায়ও ক্ষমতায় এসেছেন বটে, কিন্তু কেউই কোনো দফায় মেয়াদ শেষ করে বিদায় নিতে পারেননি। এ যেন ইসলামাবাদের কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউয়ের নিয়তি হয়ে উঠেছে।

ফলে, এবার যখন ২৮ জুলাই ৪ বছর ১ মাস ২৩ দিন শেষে নওয়াজ শরিফকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করতে হয়, বস্তুত তখন থেকেই নতুন করে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয় এবং সর্বশেষ তা ‘আরেকটি অভ্যুত্থান’-এর গুজবে পরিণত হয়ে পাকিস্তানজুড়ে নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানকালে যেকোনো দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার তাৎক্ষণিক ও সরাসরি ছাপ পড়ে যেসব স্থানে, তার মধ্যে একটি হলো ক্যাপিটাল মার্কেট। পাকিস্তানে নওয়াজ যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন দেশটির করাচি (কেএসই-১০০) স্টক এক্সচেঞ্জে সূচক ছিল ২০,০০০। আর গত বছর বাজেটকালে তা অবস্থান করছিল ৫৩,১২৪-এ। কিন্তু চলতি সপ্তাহে তা ৪০ হাজারের নিচে অবস্থান করছে। কেবল গত সাত দিনে তা ১৪৬৬ পয়েন্ট কমেছে। দেশবাসীর জন্য বিনিয়োগকারীদের বার্তাটি যে স্পষ্ট, তা বোঝা যাচ্ছে সূচকের নিম্নগতি থেকে।

প্রশ্ন হলো, বিনিয়োগকারীরা নিজেরা কী বার্তা পেয়েছেন? তাঁরা উদ্বিগ্ন কেন?

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অনেক দেশের মতোই পাকিস্তানেও সাম্প্রতিক দশকগুলোয় রাজনীতি ছিল মূলত দ্বিদলীয়। লাহোরভিত্তিক নওয়াজের মুসলিম লিগ এবং সিন্ধুভিত্তিক ভুট্টোদের পিপলস পার্টি পালা করে ইসলামাবাদের কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউতে আসছিল-যাচ্ছিল। কিন্তু এই আপাতস্থিতিশীল সমীকরণ ওলট-পালট হয়েছে ইমরান খানের উত্থানে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে নিজের জন্য সর্বোচ্চ স্থানটির দাবিতে অদম্য ফাস্ট বোলারের মতোই বিরামহীনভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ইমরান। ১৯৯৬ সালে দলীয় কার্যক্রম শুরু করলেও ছয় বছর পর ২০০২ সালের জাতীয় নির্বাচনে তাঁর দল কেবল একটি আসন পেয়েছিল। তবে সেই অবস্থা এখন আর নেই। বিরুদ্ধবাদী প্রচারমাধ্যম অবশ্য বলেই যাচ্ছে যে ১৯৯২-এর বিশ্বকাপের পর কেবল একটি মাত্র নতুন ইনিংস জিতেছেন তিনি এবং তা হলো নওয়াজ শরিফের গায়ে দুর্নীতির কলঙ্ক লেপনে সফলতা। তাও কতটা তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) কর্তৃত্ব আর কতটা পাকিস্তানের ‘ডিপ স্টেট’-এর প্রভাবে হয়েছে, সে নিয়ে বিতর্ক চলছেই। যে কারণে প্রধান প্রতিপক্ষকে মসনদচ্যুত করার পরও পিটিআইয়ের শুভানুধ্যায়ীরা কেউই নিশ্চিত নয়—আগামী বছরের মাঝামাঝি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে দলটি মুসলিম লিগকে টপকে যেতে সক্ষম হবে। তবে ৩৪২ আসনের জাতীয় পরিষদে এ মুহূর্তে মাত্র ৩৩টি আসনের অধিকারী হলেও ইমরান ও তাঁর দল যে পাকিস্তানের রাজনীতির দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় আঘাত হেনেছে এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে শহুরে তরুণদের মাঝে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়; যদিও দেশটির প্রভাবশালী সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র পিটিআইয়ের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় আছে বলেই মনে হয়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এটা হলো একটা দিক।

ইমরানকে নিয়ে দোলাচলে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—পাকিস্তানে যে দুই দেশের স্বার্থ রয়েছে সরাসরি এবং যারা আবার পরস্পরের প্রতিপক্ষ। ইমরান বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের একজন সমালোচক। অন্যদিকে, চীনের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া আছে বলেও জানা যায় না।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতের জন্যও তীব্র এক মনোযোগের বিষয়। পাকিস্তান বরাবরই ভারতের চিরস্থায়ী প্রতিপক্ষ। ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে আরএসএস-বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠায় দুই দেশের মধ্যে প্রায় অঘোষিত যুদ্ধাবস্থা চলছে বলা যায়। এরূপ চাপ দেশটিতে ভারতকেন্দ্রিক নীতিনির্ধারণে সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করেছে। এটা ছিল পাকিস্তানে গত চার বছরের আপাত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ার দ্বিতীয় বিধ্বংসী কারণ।

কিন্তু নওয়াজকে বিদায়ে উৎসাহব্যঞ্জক ভূমিকা রাখলেও ইমরান খানের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে মনস্থির করাও সেনাবাহিনীর জন্য সহজ নয়, বিশেষ করে দুটি কারণে। প্রথমত, পাকিস্তানের রাজনীতিতে যারা শেষ কথা বলতে অভ্যস্ত, সেই পাঞ্জাবে পিটিআই এখনো প্রভাবশালীদের সমর্থন পায়নি বলেই প্রতীয়মান হয়। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের ‘ইসলামপন্থী’ দলগুলোর প্রতি ইমরানের বিশেষ সহানুভূতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েই উদ্বিগ্ন। এই কারণে অনেক সময় রসিকতা করে তাঁকে ‘তালেবান খান’ও বলা হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে ইমরান পাকিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ অনেকের কাছেই আনপ্রেডিক্টেবল রয়ে গেছেন। শক্তিশালী জেনারেলরা এখনো নিশ্চিত নন, ইমরান তাঁদের কথা শুনবেন। উপরন্তু, তাঁর বিরুদ্ধেও নওয়াজের মতোই আদালতে সম্পদসংক্রান্ত তথ্য গোপন করার মামলা চলছে। সেখানে সাজা হলেও বস্তুত অকস্মাৎ তাঁর ইনিংস শেষ হয়ে যেতে পারে।

এরূপ পটভূমিতেই পাকিস্তানের প্রভাবশালী প্রচারমাধ্যমগুলোয় ‘খাকি’ ‘খাকি’ গুঞ্জন উঠেছে। পরিস্থিতি যে অসাংবিধানিক পথে এগোনোর ঝুঁকি নেওয়ার মতো চরমভাবে পেকে উঠেছে তা নয়; কিন্তু অস্থিতিশীল রাজনীতি এবং দুর্বল নেতৃত্বের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যেমন পাকিস্তানে বিকল্প হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীকে বেছে নিতে পারে, তেমনি দিল্লির আগ্রাসী কূটনীতি ও সমরকৌশলের বিপরীতে করণীয় নির্ধারণে সিভিল নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়ে সমন্বয়ে ক্লান্ত সেনা কর্মকর্তারাও নিজেদের যোগ্যতার বিষয়ে অতি উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠতে পারেন। যার আপাতস্পষ্ট কিছু লক্ষণ ইতিমধ্যে দেখা দিতে শুরু করেছে।

বিশেষ করে ১১ অক্টোবর অর্থনৈতিক রাজধানী করাচিতে পাকিস্তানের সেনাসংশ্লিষ্ট সংস্থা আইএসপিআর (ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস) জাতীয় অর্থনীতিবিষয়ক এক সেমিনারের আয়োজন করে সবাইকে চমকে দিয়েছে। পাকিস্তান চেম্বারের সহায়তায় আয়োজিত এই সেমিনারে প্রধান আলোচক ছিলেন চিফ অব আর্মি স্টাফ জাভেদ বাজওয়া! বিস্ময়কর ঘটনাটি এখানেই থেমে থাকেনি অবশ্য। আর্মি চিফ সেখানে বলেছেন, দেশের অর্থনীতি এখন ঋণের ভারে আক্রান্ত। ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ব্যাপক ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। এ থেকে উদ্ধার পেতে করের আওতা বাড়ানো উচিত। তাঁর মতে, জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় অর্থনীতি এক সূত্রে গাঁথা।

আর্মি চিফের অর্থনীতি নিয়ে এরূপ বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহসান ইকবাল। ওয়াশিংটন থেকে তিনি এই মর্মে টুইট করেন, ‘পাকিস্তানের অর্থনীতি বর্তমানে শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে, আইএসপিআরের এমন মন্তব্য করা উচিত নয়, যাতে পাকিস্তানের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়।’ আহসান ইকবালের এই মন্তব্যে আইএসপিআর পুনরায় আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।
বলা বাহুল্য, এসবই মুসলিম লিগ সরকারের সঙ্গে সেনা কর্তৃপক্ষের মনস্তাত্ত্বিক রেষারেষির প্রকাশ। এই রেষারেষির শুরু নওয়াজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তকারী সংস্থা ‘জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিমে’ দুজন সেনা কর্মকর্তা থাকায় এবং তদন্তের ফলাফল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যাওয়ায়। এরপর একই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দল বিচার বিভাগের সঙ্গেও সম্পর্ক চূড়ান্ত মাত্রায় খারাপ করে ফেলেছে। আবার এসব এমন এক সময় ঘটছে, যখন মুসলিম লীগের মধ্যেও মৃদু অন্তঃকলহ লক্ষ করা যাচ্ছে এবং তাতেও এস্টাবলিশমেন্টের (সেনাবাহিনীর?) হাত আছে বলে মনে করা হচ্ছে।

স্বভাবত ইমরান খান এবং ভুট্টোরা এই অবস্থার সুযোগ নিতে ইচ্ছুক। ফলে মুসলিম লিগের বিরোধিতা করতে গিয়ে এবং মুসলিম লিগকে ‘নিরাপত্তা বাহিনীবিরোধী’, ‘বিচার বিভাগবিরোধী’ প্রমাণ করতে গিয়ে তারা অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেও সেনা আমলাতন্ত্রের হস্তক্ষেপের পক্ষ নিচ্ছে, যা দেশবাসীর মনোজগতে ‘খাকি ছায়া’কে বাস্তব করে তুলছে। এরূপ পরিস্থিতির মুখেই ১৩ অক্টোবর আইএসপিআরের ডিজি মেজর জেনারেল আফিস গফুরকে প্রেস কনফারেন্স করে বলতে হয়, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী বেসামরিক নেতৃত্বে বিশ্বাসী এবং পাকিস্তানের গণতন্ত্রের জন্য সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো হুমকি নেই।’ বলা বাহুল্য, এতে সামরিক ছায়া উধাও হয়নি, বরং আরও গাঢ়ই হচ্ছে। এমনকি সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র, আফগানিস্তান ও চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিক ইস্যুগুলোতেও আর্মি চিফই অনুঘটকের ভূমিকা নিচ্ছেন।

কিন্তু এটাও পুরোনো বাস্তবতা যে পাকিস্তানের ইতিহাসে সিভিলিয়ান সরকারের ব্যর্থতায় বহুবার সামরিক সরকারের আবির্ভাব ঘটালেও তা অর্থনীতি, কূটনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বাড়তি কোনো সুখ বয়ে আনেনি; বরং দেশটির আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়িয়েছে তা। ফলে পাকিস্তানে অতীতে প্রত্যাবর্তনের বিরুদ্ধে রয়েছে প্রচুর সচেতন মানুষও। কিন্তু মুশকিল হলো, তাদের পাশে নেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের প্রগতিশীল মানুষ। বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে পাকিস্তানবিরোধী মনোভাবের গণ-অন্ধত্ব লক্ষ করা যায়, যা ওই দেশটির গণতান্ত্রিক শক্তিকে কোনোভাবেই সহায়তা করে না। বরং এরূপ দেশহিংসা পাকিস্তানে একধরনের অন্ধ সমরবাদিতাই উসকে দেয়, পরোক্ষ যার বলি হয় কার্যত দক্ষিণ এশিয়ার একক গণতান্ত্রিক বিকাশ। পাকিস্তানে বর্তমানে আবার যে ‘খাকি ছায়া’ তৈরি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে দেশটির সব গণতান্ত্রিক শক্তির পাশে দাঁড়ানো উচিত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তিকে।

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…