মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের চাকরির সুযোগ কমছে

মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের চাকরির সুযোগ কমছে

রবিবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ ১২:৫৯ ঘণ্টা

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশীসহ প্রবাসীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে। গাল্ফ নিউজ, সৌদি গেজেট, আরব নিউজের সংবাদ বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে।
 
এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়েশী জীবনযাপনে অভ্যস্ত উপসাগরীয় দেশগুলোকে কিছুটা হলেও অর্থনীতির রাশ টেনে ধরতে হয় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম পড়ে যাওয়ায়। কয়েক বছরের এ পতনে দেশগুলোতে বাজেট ঘাটতি ও অর্থনৈতিক মন্থরতা তৈরি হওয়ায় বেড়েছে বেকারত্ব। ফলে বৈচিত্র্যায়নের মাধ্যমে অর্থনীতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশগুলো। যার বড় চাপটি এসে পড়ে দেশগুলোতে জীবিকা নির্বাহ করা লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের ওপর।
 
বাংলাদেশীসহ সবচেয়ে বেশি প্রবাসী রয়েছে বর্তমানে সৌদি আরবে; কিন্তু এ দেশটির পাশাপাশি ওমান এবং কুয়েত সম্প্রতি তাদের বিভিন্ন খাতে বিদেশী শ্রমিক নিয়োগ সীমিত করেছে। বাকি দেশগুলোও সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে স্থানীয় নিয়োগ উৎসাহিত করছে। এ ছাড়া লিবিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও সিরিয়া এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত। অথচ এ দেশগুলোও একসময় বিদেশী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের একটি বড় উৎস ছিল।
 
সৌদি আরবের বিভিন্ন খাতে বর্তমানে ১০ লাখ বাংলাদেশীসহ এক কোটি ৭৯ লাখ প্রবাসী কাজ করছে। অর্থনীতি শক্তিশালী করতে গত বছর ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করে দেশটি। এতে বলা হয়, সৌদি আরবে বর্তমানে খুচরা খাতে কর্মীর সংখ্যা ১৫ লাখ। এর মধ্যে মাত্র তিন লাখ সৌদি নাগরিক। আগামী ২০২০ সাল নাগাদ এ খাতে স্থানীয় কর্মী করা হবে ১০ লাখ।
 
সেই লক্ষ্য পূরণে গত বছরের ২১ এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপনে সৌদি সরকার জানিয়ে দেয়, এখন থেকে শপিংমলগুলোতে প্রবাসীরা চাকরি করতে পারবে না। এর আগে নিষিদ্ধ করা হয়, মোবাইল ফোন, বোরকার দোকান, রেন্ট-এ কার, হিসাবরক্ষণ, নারীদের তৈরি পোশাকের দোকানে কাজ। গত মাসে নতুন করে ১২ ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রবাসীদের কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়।
 
এ প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে ঘড়ির দোকান, চশমার দোকান, মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিকস, গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রি, গৃহ নির্মাণ সামগ্রী, কার্পেট, অটোমোবাইল, হোম ফার্নিচার, তৈরি অফিস সামগ্রী, তৈরি পোশাক বিক্রি, শিশু ও পুরুষের জামাকাপড়, গৃহস্থালি পণ্য এবং পেস্ট্রি সোপ ইত্যাদি। এতে বেকার হয়ে পড়ছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ শ্রমিক।
 
সৌদি আরবের অর্থনীতি ও পরিকল্পনামন্ত্রী মোহাম্মদ আলী-তুওয়াইজিরি জানান, তাঁর মন্ত্রণালয়ের অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক কাজ হচ্ছে বিদেশি শ্রমিকের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে আনা।
 
এদিকে টাইমস অব ওমানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি ওমান সরকার তাদের দেশে ৮৭টি পেশায় বিদেশীদের ভিসা প্রদান সাময়িক স্থগিত করেছে। এ আদেশ আপাতত ছয় মাসের জন্য দেওয়া হয়েছে। দেশটি স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াতে এ উদ্যোগ নিয়েছে। এসব পেশার মধ্যে রয়েছে তথ্য ও প্রযুক্তি খাত, হিসাব ও অর্থ, বিপণন ও বিক্রি, প্রশাসন ও মানবসম্পদ, বীমা, মিডিয়া, স্বাস্থ্যসেবা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা।
 
অন্যদিকে কুয়েত সরকার সরাসরি কোনো পদক্ষেপ ঘোষণা না করলেও দেশটির সরকারি চাকরিতে ক্রমান্বয়ে বিদেশীদের সরিয়ে স্থানীয়দের স্থলাভিষিক্ত করা হচ্ছে। আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি করা বেশসংখ্যক প্রবাসীকে বলা হবে বিধি অনুযায়ী তাদের চাকরি থেকে বিদায় নিতে। সে স্থান পূরণ করা হবে দেশের নাগরিকদের দিয়ে।
 
সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সৌদি আরবে বর্তমানে বেকারত্বের হার ১২.৮ শতাংশ, ওমানে ১২ শতাংশ, এ ছাড়া কুয়েতে ২.২ শতাংশ। বিপুলসংখ্যক বেকারকে চাকরির সুযোগ করে দিতে দেশগুলো সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে নানাভাবেই স্থানীয়দের কর্মসংস্থানে উৎসাহিত করছে। অনেকের মতে, এ দেশগুলোর এসব পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশীসহ লাখ লাখ প্রবাসী চাকরি হারাবে।
 
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সাধারণত যেসব খাতে বিদেশী শ্রমিকদের নিয়োগ নিষিদ্ধ করছে সেসব খাতে বাংলাদেশ শ্রমিক কমই আছে। বিশেষ করে নির্মাণ খাতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী রয়েছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। তবে তাদের এ সিদ্ধান্তে দোকানসহ ও ভালোমানের চাকরিতে থাকা কিছুসংখ্যক বাংলাদেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি খুব বেশিসংখ্যক না হলেও বাংলাদেশ সরকার সুসম্পর্ক এবং দক্ষ কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশীদের সহযোগিতা করতে পারে।’
 
তিনি বলেন, তারা বিভিন্ন পেশায় প্রবাসীদের বিতাড়িত করতে চাইলেও অনেক ক্ষেত্রে এসব পদক্ষেপ কাজে লাগাতে পারছে না। কারণ স্থানীয়রা এখনো সব কাজের জন্য প্রস্তুত নয়। ফলে আমাদের খুব বেশি চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। তবে অবশ্যই বড় শ্রমবাজার হিসেবে এ বিষয়ে আমাদের সরকারকে নজরে রাখতে হবে।’

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…