অধিনায়ক, টেস্ট ক্রিকেট কিন্তু বাজি নয়

অধিনায়ক, টেস্ট ক্রিকেট কিন্তু বাজি নয়

রবিবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ ২০:৫২ ঘণ্টা

শেন ওয়ার্নের জুয়াপ্রীতির কথা সবাই জানে। দুদণ্ড সময় পেলেই ‘পোকার’ খেলতে বসেন। কিন্তু আমাদের কাছে তিনি ক্রিকেটের চিরকালীন ‘মায়াবী ঘাতক’। এই অধিষ্ঠানের নেপথ্যে রয়েছে সহজাত প্রতিভার সঙ্গে ক্রিকেট নিয়ে তাঁর দর্শন। ওয়ার্ন নিজেই একবার বলেছিলেন, ‘আমার কাছে ক্রিকেট অতি সরল একটা খেলা। মাঠে গিয়ে এটা সরল রেখেই খেলি।’

কিন্তু ক্রিকেট সবার কাছেই কী এত সরল? মাঠে গিয়ে সবাই কী খেলাটাকে ওয়ার্নের মতো সরল রাখতে পারেন? বোধ হয় না, এমনকি ওয়ার্নের মতের সঙ্গে অনেকে একমতও হবেন না। মাহমুদউল্লাহর কাছে ‘ক্রিকেট খেলা তো একটা বাজির মতো।’ তাঁর মনে হয়, এগিয়ে যেতে হলে ‘এ ধরনের বাজিগুলো ধরতেই হবে’।

তো, সেটা কোন ধরনের বাজি?

এই ধরুন, চট্টগ্রাম টেস্টে পাটা উইকেটে ব্যাটসম্যানদের ভালো করতে দেখে মিরপুরে টিম ম্যানেজমেন্টের ‘ট্রাম্প’ করার চেষ্টা—শেরেবাংলার উইকেট স্পিনবান্ধব উইকেট বানানো। তাতে প্রতিপক্ষ দলের স্পিনাররা সুবিধা পেয়ে গেলেও ভয় কিসের? আমাদের ব্যাটসম্যানরা তো আছেন। হেরাথ-পেরেরাদের তাঁরাই দেখভাল করবেন আর আমাদের স্পিনাররা এই সুযোগে তাঁদের ব্যাটসম্যানদের বিবশ করে দেবে—এই স্বপ্নমেদুর ভাবনাই বাজি, এটাই ক্রিকেট!
মাহমুদউল্লাহর চিন্তায় ভুল ছিল না। মিরপুরের উইকেটের অমন সুবিধা নিয়েই তো ক্রিকেটের দুই কুলীন দেশকে মাটিতে নামিয়ে এনেছে বাংলাদেশ। স্পিনাররা বলটাকে লাট্টু বানিয়েছেন, ব্যাটসম্যানরাও এ উইকেটে প্রয়োজনীয় রানের সম্বলটুকু দিয়েছেন। এক সেশনে দশ উইকেট ফেলে দিয়ে ম্যাচ জেতার বিলুপ্তপ্রায় স্মৃতি ফিরিয়ে আনা তো এই মিরপুরেই।

অভিষিক্ত ধনঞ্জয়া দুই ইনিংসে ৮ উইকেট তুলে নিয়ে উল্টো বাংলাদেশকে ধাক্কা দিয়েছেন। ছবি: প্রথম আলো

অভিষিক্ত ধনঞ্জয়া দুই ইনিংসে ৮ উইকেট তুলে নিয়ে উল্টো বাংলাদেশকে ধাক্কা দিয়েছেন। ছবি: প্রথম আলোতবে অধিনায়কের ভুল ছিল অন্য এক দিক থেকে। আসলে দুটি বিষয়ে। প্রথমত, দলে সাকিব আল হাসান নামের এক ব্যক্তির অভাব। মিরপুরের উইকেট নাগপুর কিংবা গলের উইকেট নয়। এখানে বলে বড় বাঁক কখনোই নেয় না। এখানে ঘুরিয়ে নয়, ব্যাটসম্যানের ‘দম’ আটকে উইকেট তুলে নিতে হয়। এ কাজে সাকিবের মতো পারঙ্গম কেউ নেই। আর এমন উইকেটে সাকিবের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং আসলেই বাড়তি কিছু রান এনে দেয়, যেটা ‘ইতিবাচক’ ব্যাটিংয়েও দলের সবাই এনে দিতে পারেন না।
দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রাম টেস্টের ব্যাটিং পারফরম্যান্স বাংলাদেশ দলকে আত্মবিশ্বাসী করেছিল। সে টেস্টের স্কোরকার্ড কী বলছে? বলছে, শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের চেয়ে ২০০ রান বেশি তুলেছে এবং দ্বিতীয় ইনিংসে মুমিনুল-লিটন না দাঁড়িয়ে গেলে, অমন ন্যাড়া উইকেটেও হারের শঙ্কা ছিল। এই ব্যাটিংয়েই এতটা আত্মবিশ্বাসী হওয়া বোধ হয় বেশ বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে।
স্পিনারদের বিষয়ে ওপর আস্থা রাখার ব্যাপারেও চট্টগ্রাম টেস্টের প্রসঙ্গ টেনে আনা যায়। শ্রীলঙ্কা সে টেস্টে এক ইনিংস ব্যাটিং করেছে, যেখানে স্পিনারদের সম্মিলিত শিকার ৮ উইকেট। সানজামুল নিয়েছেন ১ উইকেট এবং তাইজুল ইসলাম (৪/২১৯), মেহেদী হাসান মিরাজের (৩/১৭৪) সম্মিলিত শিকার ৭ উইকেট।
তাইজুল ও মিরাজের রান দেওয়ার পরিসংখ্যানটা একবার খেয়াল করুন। শ্রীলঙ্কার সেই ইনিংসে টেস্টে বাংলাদেশের বোলারদের মধ্য সর্বোচ্চ রান দেওয়ার রেকর্ড গড়েন তাইজুল। অন্যদিকে মিরাজ আরেকটু হলেই নিজেকে ছাপিয়ে যেতেন! আর মাত্র ৫ রান দিলেই নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রান দেওয়ার রেকর্ডটা নতুন করে লেখাতেন এ স্পিনার।

রান দেওয়ার প্রসঙ্গ উঠছে কারণ, চট্টগ্রামে উইকেট নিলেও তাঁরা কিন্তু ব্যাটসম্যানদের ‘দম’ আটকে রাখতে পারেনি। কিন্তু তারপরও সাকিবের অনুপস্থিতিতে দলের প্রধান এ দুই স্পিনারের ওপর ভরসা রেখে মিরপুরে স্পিন-বান্ধব উইকেট বানানো হয়। তাইজুল শ্রীলঙ্কার দুই ইনিংস মিলিয়ে ৮ উইকেট আর মিরাজ ২ উইকেট পেলেও রান কিন্তু আটকানো যায়নি। অথচ এমন উইকেটে একেকটা রান ছিল মহাগুরুত্বপূর্ণ!
মিরপুরে হারের পর মাহমুদউল্লাহ নিজেরই আত্মোপলব্ধি, ‘আপনি হেরাথ, দিলরুয়ান বা আকিলার বোলিং দেখেন, আমরা যে কয়টা বাউন্ডারি মেরেছি অনেক ঝুঁকি নিয়ে মারতে হয়েছে। আমাদের স্পিনাররা পাঁচটা বল ভালো করেছে, একটা বল সহজ বাউন্ডারি দিয়েছে। এ ব্যাপারটা ওদের চাপ কমিয়ে দিয়েছে। আমাদের স্পিনারদের আরেকটু ভালো করা উচিত ছিল।’

সেই ‘আরেকটু ভালো করা’র ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার আগেই মাঠে ‘বাজি’ খেলতে নেমে যাওয়া বোকামি ছাড়া আর কি? মাহমুদউল্লাহর কাঠগড়ায় অবশ্য ‘ব্যাটসম্যানরাই বেশি দায়ী’। কারণ তিনি বোলারদের পাশাপাশি ব্যাটসম্যানদের ওপরও ভরসা রেখেছিলেন। কিন্তু কোনো কিছুই ঠিকমতো না হওয়ায় ম্যাচটা বাজেভাবে হারতে হয়েছে।
অধিনায়ক কিন্তু তারপরও স্পিনিং উইকেট বানানোর পক্ষে। হারের পর সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘নিষ্প্রাণ উইকেটে খেললে আমার মনে হয় না আমাদের ক্রিকেট এগোবে। আমরা জানতাম এখানে ফল হবে। সামর্থ্য আছে কিন্তু তা করে দেখাতে পারিনি। মাঠে স্কিলটা দেখাতে পারিনি।’

অধিনায়ক বাস্তবতা মেনেই বলেছেন। কিন্তু সেখানে একটি ফোঁকর আছে। এ দুটি বিভাগের একটির অন্তত মাঠে কিছু করে দেখানোর ন্যূনতম নিশ্চয়তা থাকলেও স্পিনিং উইকেট বানানোর ‘বাজি’ খেলাটা যৌক্তিক বলে মনে হতো। সতীর্থদের তরফ থেকে যেখানে এখনো সামর্থ্যের কোনো রকম নিশ্চয়তা পাওয়ার সময় আসেনি, সেখানে অধিনায়কের ‘জুয়া’ খেলতে বসার পরিণাম যেন মহাভারতের সেই অংশটুকুর মতো—যুধিষ্ঠির পাশা খেলায় হেরে যাওয়ায় দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ!

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…