যেকোনো পজিশনেই প্রস্তুত ইমরুল

মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১৫:৫৯ ঘণ্টা

এশিয়া কাপের এবারের আসরের শুরু থেকেই ওপেনিং নিয়ে ভুগতে হয়েছে বাংলাদেশ দলকে। সংকট নিরসনে প্রথাগত নিয়ম ভেঙে টুর্নামেন্টের মাঝপথেই ইমরুল কায়েস ও সৌম্য সরকারকে উড়িয়ে এনেছে টিম ম্যানেজমেন্ট। আচমকা এই সিদ্ধান্ত যতটানা অপ্রত্যাশিত ছিল তারচেয়েও বেশি ছিল বিস্ময়ের। পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়া আফগানিস্তান ম্যাচে তো রীতিমতো মহাবিস্ময়। ওপেনিং সমস্যার নিরাময় খুঁজতে যাদের দেশ থেকে উড়িয়ে আনা হলো তাদের একজনের ঠাঁই হলো না টপঅর্ডারে!

সৌম্যের যে একাদশে জায়গা হচ্ছে না, সেটা এক প্রকার অনুমিতই ছিল। আফগানদের বিপক্ষে ব্যাট হাতে দাঁড়ানোর সুযোগটা পেলেন ইমরুল। সেটাও ওপেনিং কিংবা টপঅর্ডারে নয়; বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যানকে বাইশ গজে পাঠানো হলো বাংলাদেশের ছয় নাম্বার ব্যাটসম্যান হিসেবে। এক দশকের ক্যারিয়ারে মিডল অর্ডারে ব্যাট করার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম হলো ইমরুলের।

খুলনা থেকে যশোর, তারপর ঢাকা। সেখান থেকে উড়োযানে সোজা দুবাই। অপ্রত্যাশিত স্বপ্ন পূরণের চাপা উত্তেজনায় হয়তো বিনিদ্রায় রাত কাটাতে হয়েছিল ইমরুলকে। আরব আমিরাতের প্রতিকূল কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ১২ ঘণ্টাও সময় পাননি এই বাঁ-হাতি। ঘুম থেকে উঠেই দেড় ঘণ্টার সড়কযাত্রা। দুবাই থেকে লড়াইয়ের মঞ্চ আবুধাবির শেখ আবু জায়েদ স্টেডিয়ামে।

আবুধাবির বাইশ গজে ইমরুল এমন সময় এলেন, যখন দল চাপের মুখে। চাপটা পাহাড়সম হয়ে উঠল ভুল বোঝাবুঝিতে ব্যাটিং স্তম্ভ মুশফিকুর রহিম সাজঘরে ফিরে যাওয়ায়। ৮৭ রানে ৫ উইকেট খুইয়ে তখন রীতিমতো কাঁপছে বাংলাদেশ দল! নিজেকে প্রমাণ করতে এর চেয়ে অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারতেন না বত্রিশ বছর ছুঁই ছুঁই ইমরুল। দশ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধ্যায়ে প্রথমবার মিডল অর্ডারে ব্যাট ধরে শারীরিক ও মানসিক শক্তির চূড়ান্ত পরীক্ষা দিলেন তিনি। তীব্র দাবদাহের মধ্যেই আফগান বোলারদের ভুগিয়ে খেলেছেন ৭২ রানের কার্যকর ইনিংস। ক্যারিয়ারজুড়ে দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকা ইমরুল যে এভাবে ত্রাণকর্তা হয়ে উঠবেন, এমন একটা ইনিংস খেলবেন; সেটা ছিল কল্পনারও বাইরে।

এশিয়া কাপের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বাংলাদেশের এ জয়ের আসল নায়কও হতে পারতেন। কিন্তু মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্স তাকে দিয়েছে পার্শ্বনায়কের ভূমিকা। তবে দলের জয়ে অবদান রাখতে পেরেই খুশি ইমরুল। তবে উচ্ছ্বাস চেপে রেখেছেন তিনি। ঠিক যেন বিনয়ের অবতার! অবশ্য এ রকম মনোভাব পেশাদার ক্রিকেটারদের মানায়; স্বাভাবিকও। কিছুটা অস্বাভাবিক ঠেকল দীর্ঘ সময় উইকেটে থিতু হয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যাট করাটা।

মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বিশ্বমানের বোলার রশিদ খান, মুজিব উর রহমানদের ইমরুল খেলেছেন অবলীলায়। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের সাবেক সতীর্থকে মোকাবিলা করার জন্যই মূলত তাকে পাঠানো হয়েছে ছ নাম্বারে। পজিশন নিচে হলেও ম্যাচে ইমরুলের রানের গ্রাফ ছিল ওপরের দিকেই। তবে এজন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে। ইউটিউবে রশিদ খানের বোলিং নিয়ে করেছেন পড়াশোনা; সাফল্যটাও পেয়েছেন হাতেনাতেই। সাফল্যের এই রহস্যটা কাল প্রচার মাধ্যমের সামনে নিজেই উন্মোচন করেছেন ইমরুল।

বহু দিন ধরে ছয় নাম্বার পজিশনে নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যাটসম্যান নেই বাংলাদেশ দলে। সবশেষ নাসির হোসেন যা আস্থার প্রতিদান দিতে পেরেছিলেন এই জায়গা থেকে। জাতীয় দলে নাসিরের নাম অবশ্য এত দিনে হারিয়ে গেছে মহাকালের বিলীন গর্ভে। ওপেনার ইমরুল সেই শূন্যস্থানটা আফগান ম্যাচে পূরণ করে দিলেন। জানালেন দলের প্রয়োজনে নিজের জায়গা টপঅর্ডার কেন, যেকোনো পজিশনেই খেলতে প্রস্তুত আছেন তিনি, ‘দলের প্রয়োজনে আমি যেকোনো পজিশনে খেলতে প্রস্তুত আছি। ওপেনিং ব্যাটসম্যানরা যখন বড় ইনিংস খেলে তখন তারা সব পরিস্থিতিতে ব্যাটিং করার মতো উপযুক্ত হয়ে উঠে। তাই ছয় কিংবা চার নাম্বারে ব্যাট করা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। এটা ম্যানেজমেন্টের বিষয়।’

উত্থান-পতনের ক্যারিয়ারে আফগান ম্যাচটা হয়তো নতুন শুরুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে ইমরুলকে। কিন্তু এই পথচলা কতটা দীর্ঘায়িত হবে, তা নিয়ে নিজেও আছেন সংশয়ে, ‘(টার্নিং পয়েন্ট) হতে পারে, নাও হাতে পারে।’ তবে এত কিছু ভাবছেন না ইমরুল। নিজের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিয়েছেন ভাগ্যের ওপর। আপাতত তার ভাবনায় আগামীকালকের পাকিস্তানের বিপক্ষে ‘অলিখিত সেমিফাইনাল’ ম্যাচ। যেখানে আরো একবার অভিজ্ঞতার মূল্য দিতে চান ইমরুল।

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…