যেভাবে রুখবেন সাইবার ঝুঁকি

রবিবার, ১৪ মে ২০১৭ ১৩:৪২ ঘণ্টা

ওয়ানা ক্রিপ্টো বা ওয়ানা ক্রাই নামে একটি সাইবার অস্ত্র তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ)। উইন্ডোজ ফাইল এনক্রিপ্ট করার জন্য তৈরি এই সাইবার অস্ত্রটি চুরি করে হ্যাকাররা। সেই চুরি করা সাইবার অস্ত্রটি এখন সাইবার জগতে ত্রাস সৃষ্টি করছে। আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১০০টি দেশের পৌনে এক লাখ কম্পিউটার নেটওয়ার্ক। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওই হ্যাকিং টুল ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে এই সাইবার হামলা চালোনো সম্ভব হয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তার খ্যাতিমান ফার্ম ক্যাসপারস্কি ল্যাব সূত্রে জানা গেছে, ‘শ্যাডো ব্রোকার্স’ নামে পরিচয় দেয়া হ্যাকারদের একটি গ্রুপ গত ১৪ এপ্রিলে সাইবার অ্যাটাকের এক গাদা টুল ফাঁস করে। যেগুলোর অনেকগুলোতে এনএসএ-এর সিল ছিল। এর মধ্য থেকে ‘এটারনাল ব্লু’ টুলটি ব্যবহার করে সাইবার হামলাটি হয়েছে। তবে সাপ্তাহিক ছুটির দিন এবং শবে বরাতের ছুটি থাকায় এ দিন বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই বন্ধ থাকায় হামালায় আক্রান্ত হয়নি বাংলাদেশ। তবে দেশের বিমানবন্দর এবং ব্যাংকিং খাতটি সাইবার ঝুঁকিতে আছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছন দেশের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।   

এ বিষয়ে ন্যাশনাল ডেটা সেন্টারের পরিচালক তারেক বরকত উল্লাহ ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘এনএসএ থেকে চুরি করা ওয়ানা ক্রিপ্টো বা ওয়ানা ক্রাই নামের র‌্যানসামওয়্যার দিয়ে যে হামলা করা হয়েছে তার প্রধান লক্ষ্য ছিলো অনলাইন সেবা খাত। উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের ত্রুটি কাজে লাগিয়ে এই হামলাটি হয়েছে। তবে সরকারি সব সেবার ক্ষেত্রে আমরা যেহেতু উইন্ডোজের পরিবর্তে লিনাক্স ব্যবহার করি তাই আমরা আক্রান্ত হইনি। আমাদের সাইবার ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম (সার্ট) পরীক্ষা করে দেখেছে আমরা নিরাপদে আছি।’

অবশ্য বেসরকারিভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতগুলো যেহেতু উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করে তাই তাদের ঝুকি রয়েছে বলে জানান এই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ।

তারেক বরকতুল্লাহ বলেন, ‘এ জন্য উদ্বিগ্ন হবার কারণ নেই। কেননা ইতোমধ্যে ম্যালওয়্যারটি শনাক্ত করা গেছে। এটি ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা মুছে ফেলতে সক্ষম।’

তিনি আরও বলেন, ‘মূলত অরিজিন্যাল উইন্ডোজ সিস্টেম ব্যবহার করা এবং এইট লাইভ আপডেট করা থাকলে এই ধরনের আক্রমণ থেকে বাঁচা যায়। আর যেহেতু বাংলাদেশে পাইরেটেড সফটওয়্যার বেশি ব্যবহৃত হয় সেজন্য ক্যস্পারস্কি, নরটন কিংবা ট্রেন্ড মাইক্রোর মতো অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করলে ঝুঁকি মুক্ত থাকা যাবে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে উইন্ডোজ ফোন ব্যবহারকারীদের জন্য ৩৬০ অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার ও অটো আপডেট অপশন চালু রাখার পরামর্শ দেন তারেক বরকতুল্লাহ।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুক্তিযোদ্ধা ড. এমারত হোসেন পান্না বলেন, ‘র‌্যানসাম ওয়্যার হলো এক ধরনের ভাইরাস, যেটি কিনা একটি কম্পিউটার ডিভাইসকে আক্রান্ত করার পর ব্যবহারকারীকে তার মেশিনে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখে এবং ব্যবহারকারীর প্রবেশগম্যতা সীমাবদ্ধ করে দেয়। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে ব্যবহারকারীর কাছ থেকে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ফলে দেশের বিমানবন্দরসহ কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত আর্থিক সেবা খাত এই ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবেলা করতে তিনি বিদেশ থেকে নিরাপত্তাবিদ ভাড়া করার চেয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাইবার নিরাপত্তা কর্মী তৈরির প্রতি জোর দেন।

সাবাইর ঝুঁকি নিয়ে তরুণ সফটওয়্যার ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানগুলো পাইরেটেড উইন্ডোজ সফটওয়্যার ব্যবহার করে থাকে। অনেকের জন্য এটি কেনা ব্যয়বহুল। আর এর ব্যবহার সম্পর্কে অনেকেই ভালোভাবে জানেন না। তাই সরকারের উচিত ভাইরাস ও ম্যালওয়্যারের আক্রমণমুক্ত লিন্যাক্স সফটওয়্যারের সরবরাহ বাড়ানো। এতে ব্যয় ও ঝুঁকি উভয়ই কমবে।’

তিনি আরও বলেন, কেবল নেটওয়র্ক নয়, পেনড্রাইভ থেকেও এটা ছড়াতে পারে। তাই কোনো ফাইল খোলার ক্ষেত্রে ডাবল ক্লিক করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘অপরিচিত মেইল খোলা বা সন্দেহভাজন ভিডিওতে ক্লিক করলে ঝুঁকি বাড়বে।’

বিশিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং বিডিনগ বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘বিপদ এড়াতে সিস্টেমের সুরক্ষা বিষয়ে আমাদের সকলকে সজাগ হতে হবে। সবার মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।’
 
তিনি বলেন, ‘কম্পিউটার সিস্টেমের প্যাচ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার হালনাগাদ করার অভ্যাস করা গেলে এ ধরনের আক্রমণ থেকে আমরা বেঁচে থাকতে পারবো। পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার কমিয়ে দিলে হামলায় ক্ষতি কম হবে।’

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…